
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা: কারণ, লক্ষণ ও উপশমের সহজ উপায়

গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা: কারণ ও উপশম
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা এত সাধারণ যে প্রায় প্রতিটি মা-ই জীবনের এই সময়ে কোমরে বা পিঠে টান অনুভব করেন। কেউ প্রথম মাস থেকেই অস্বস্তিতে ভোগেন, আবার কারও ব্যথা শুরু হয় সাত-আট মাসে গিয়ে।
সমস্যা হলো, অনেক সময় বোঝা যায় না ব্যথাটা স্বাভাবিক নাকি কোনো সমস্যার ইঙ্গিত। সুখবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফল, আর ছোট কিছু অভ্যাস বদলালেই অনেকটা আরাম পাওয়া যায়।
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা কেন হয়?
গর্ভাবস্থায় শরীরে একসঙ্গে অনেক বদল আসে, আর সেই বদলগুলোই পিঠের ওপর চাপ ফেলে। সাধারণত যেসব কারণে ব্যথা হয়:
- হরমোনের প্রভাব: রিল্যাক্সিন হরমোন কোমরের লিগামেন্ট ও জয়েন্ট নরম করে প্রসবের প্রস্তুতি নেয়। এতে মেরুদণ্ড আগের মতো শক্ত সহায়তা পায় না। শরীরে আগে থেকেই হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থাকলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
- ওজন বৃদ্ধি: শিশু ও জরায়ু বড় হওয়ার সঙ্গে ওজন বাড়ে, আর বাড়তি ভার সরাসরি কোমরের নিচের অংশে পড়ে।
- ভঙ্গির পরিবর্তন: পেট সামনে এগিয়ে এলে শরীরের ভারকেন্দ্র সরে যায়, তখন কোমর অনেকটা সামনের দিকে বেঁকে থাকে।
- পেটের পেশি দুর্বল হওয়া: পেটের পেশি টান হয়ে গেলে পিঠের পেশিকে বাড়তি কাজ করতে হয়।
- মানসিক চাপ: দুশ্চিন্তা বা ঘুমের অভাবে পিঠের পেশি শক্ত হয়ে ব্যথা বাড়ে।
গর্ভাবস্থার প্রথম মাসে পিঠে ব্যথা কেন হয়?
প্রথম মাসে পেট তো বড় হয় না, তবু অনেকেরই কোমরে ভার ভার লাগে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকে। প্রজেস্টেরন ও রিল্যাক্সিন হরমোন হঠাৎ বেড়ে যায়, জরায়ুতে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং তলপেটে টান ধরে। ভ্রূণ জরায়ুর দেয়ালে বসার সময় হালকা ক্র্যাম্প হয়, যা ইমপ্লান্টেশনের লক্ষণ ও উপসর্গের অংশ। এ ছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য আর গ্যাসের ব্যথাও অনেক সময় পিঠে ছড়িয়ে পড়ে।
হালকা ব্যথা সাধারণত চিন্তার কিছু নয়। তবে সঙ্গে রক্তপাত বা একপাশে তীব্র ব্যথা থাকলে দেরি না করে ডাক্তারকে জানান।
গর্ভাবস্থায় কখন থেকে পিঠে ব্যথা শুরু হয়?
ব্যথা কবে শুরু হবে, তা প্রতিটি মায়ের ক্ষেত্রে আলাদা। তবে মোটামুটি একটা ধারণা এরকম:
- প্রথম ত্রৈমাসিক (১ থেকে ৩ মাস): হরমোনের কারণে হালকা কোমর ব্যথা বা টান ভাব দেখা দিতে পারে। অনেকের অবশ্য এই সময় কিছুই হয় না।
- দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক (৪ থেকে ৬ মাস): পেট বড় হতে থাকায় শরীরের ভঙ্গি বদলে যায়। বেশিরভাগ মায়ের ব্যথা এই সময় স্পষ্ট হয়।
- তৃতীয় ত্রৈমাসিক (৭ থেকে ৯ মাস): শিশুর ওজন ও আকার বাড়ায় ব্যথা সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়, বিশেষ করে রাতে শুয়ে থাকার সময় আর অনেকক্ষণ হাঁটলে।
প্রথমবার মা হলে বা আগে থেকে কোমরের সমস্যা থাকলে ব্যথা একটু আগেই শুরু হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় শরীরের কোন কোন অংশে পিঠে ব্যথা হতে পারে?
ব্যথা সবসময় শুধু কোমরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কয়েকটি জায়গায় এটি বেশি দেখা যায়:
- কোমরের নিচের অংশ: সবচেয়ে সাধারণ জায়গা। একেই lower back pain বলা হয়।
- পিঠের উপরের অংশ: স্তন বড় ও ভারী হওয়ায় কাঁধ ও ঘাড়ের মাঝখানে টান ধরে।
- পেলভিস ও টেলবোন: ওঠা-বসা বা পাশ ফেরার সময় কুঁচকি, নিতম্ব ও মেরুদণ্ডের একেবারে নিচে ব্যথা হয়।
- নিতম্ব থেকে পা: একে সায়াটিকা বলে। নিতম্ব থেকে পায়ের দিকে ঝিনঝিন বা তীব্র ব্যথা নামতে থাকে।
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথার চিকিৎসা
পিঠে ব্যথা বাড়লে নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। ডাক্তার আগে ব্যথার কারণ খুঁজে দেখেন। প্রয়োজন মনে করলে ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ডের মতো পরীক্ষা করাতে বলতে পারেন, যাতে জরায়ু বা শিশুর কোনো সমস্যা থাকলে ধরা পড়ে। সাধারণ চিকিৎসার মধ্যে আছে:
- গর্ভাবস্থায় নিরাপদ ফিজিওথেরাপি
- কোমরের ভার কমাতে ম্যাটারনিটি সাপোর্ট বেল্ট
- প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের হাতে হালকা ম্যাসাজ
- ডাক্তারের পরামর্শে নিরাপদ ব্যথানাশক
আইবুপ্রোফেন বা ডাইক্লোফেনাকের মতো ওষুধ গর্ভাবস্থায় ডাক্তারের অনুমতি ছাড়া কখনোই খাবেন না। অনেক ক্ষেত্রে ওষুধের চেয়ে সঠিক ব্যায়াম আর ভঙ্গির যত্নই বেশি কাজ করে।
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়
বেশিরভাগ হালকা ব্যথায় ঘরোয়া যত্নেই আরাম মেলে:
- গরম সেঁক: কোমরে হালকা গরম সেঁক দিন। পেটে সেঁক দেবেন না, আর জল বেশি গরমও যেন না হয়।
- ঘুমের ভঙ্গি: বাঁ কাত হয়ে শুয়ে দুই হাঁটুর মাঝে একটা বালিশ রাখলে কোমরের চাপ কমে।
- কুসুম গরম জলে গোসল: পেশির টান আলগা হয়, ঘুমও ভালো আসে।
- হালকা ম্যাসাজ: পরিবারের কাউকে দিয়ে কোমরে আলতো করে ম্যাসাজ করিয়ে নিন।
- বিশ্রাম: দিনের মাঝে কিছুক্ষণ পা উঁচু করে বিশ্রাম নিন।
- প্রচুর জল: পর্যাপ্ত জল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে, তাতে পিঠের অস্বস্তিও কমে।
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথায় কোন ব্যায়াম উপকারী?
ব্যায়াম শুরুর আগে অবশ্যই ডাক্তারের অনুমতি নিন। সাধারণত এগুলো উপকারী:
- পেলভিক টিল্ট: দাঁড়িয়ে বা শুয়ে কোমর হালকা করে সামনে-পিছনে দোলানো।
- ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ: হাত-হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে পিঠ ধীরে বাঁকানো ও সোজা করা।
- হাঁটা ও সাঁতার: দুটোই মেরুদণ্ডের ওপর চাপ কম রাখে আর রক্তচলাচল ভালো করে।
- প্রসবপূর্ব যোগব্যায়াম: নিয়মিত গর্ভাবস্থার যোগব্যায়াম করলে পেশি নমনীয় থাকে, শ্বাসপ্রশ্বাসও নিয়ন্ত্রণে আসে।
ব্যায়ামের সময় ব্যথা বাড়লে বা মাথা ঘুরলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যান।
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা এড়ানোর উপায়
ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই ব্যথা অনেক কমে যায়:
- সোজা হয়ে বসুন, আর পিঠের পেছনে একটা ছোট কুশন রাখুন।
- ভারী জিনিস তোলার সময় কোমর নয়, হাঁটু ভাঁজ করুন।
- হাই হিল এড়িয়ে আরামদায়ক, নরম সোলের জুতো পরুন।
- অনেকক্ষণ এক ভঙ্গিতে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকবেন না।
- মাঝারি শক্ত তোষকে ঘুমান, খুব নরম বিছানা এড়িয়ে চলুন।
- ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা কখন গুরুতর হতে পারে?
নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে অপেক্ষা না করে ডাক্তারের কাছে যান:
- বিশ্রাম নিলেও কমছে না এমন তীব্র ব্যথা
- যোনিপথে রক্তপাত বা জলের মতো স্রাব
- জ্বর বা প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া
- পায়ে অসাড়ভাব বা দুর্বলতা
- নিয়মিত বিরতিতে আসা পেটের ব্যথা বা সংকোচন
- শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া
শুরুর দিকে একপাশে তীব্র ব্যথা ও রক্তপাত হলে তা এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির লক্ষণ হতে পারে। আবার তলপেট ও কোমরে ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথার সঙ্গে রক্তপাত থাকলে গর্ভপাতের লক্ষণ ও কারণ নিয়েও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা জরুরি। তাই এসব উপসর্গ কখনো হালকাভাবে নেবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
- গর্ভাবস্থার কোন মাসে পিঠে ব্যথা শুরু হয়?
অনেকের প্রথম মাস থেকেই হালকা ব্যথা হয়। তবে সাধারণত চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে ব্যথা স্পষ্ট হয়, আর শেষ তিন মাসে সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়।
- গর্ভাবস্থায় সারাক্ষণ পিঠে ব্যথা থাকা কি স্বাভাবিক?
হালকা ও মাঝেমধ্যে ব্যথা স্বাভাবিক। কিন্তু ব্যথা একটানা, তীব্র বা রাতে ঘুম ভাঙিয়ে দেওয়ার মতো হলে ডাক্তারকে জানান।
- কোমর ব্যথায় কোন স্ট্রেচ উপকারী?
পেলভিক টিল্ট, ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ আর চাইল্ডস পোজের হালকা রূপ সাধারণত উপকারী। তবে ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে ধীরে ধীরে করুন।
- গর্ভবতী মা পিঠে ব্যথায় কোন ওষুধ খেতে পারেন?
নিজে থেকে কোনো ওষুধ নয়। প্রয়োজনে ডাক্তার প্যারাসিটামলের মতো নিরাপদ ওষুধ বেছে দিতে পারেন।
- গর্ভাবস্থায় কোন ভঙ্গিতে বসা এড়ানো উচিত?
পা ক্রস করে বসা, কুঁজো হয়ে বসা আর পিঠে সাপোর্ট ছাড়া অনেকক্ষণ বসে থাকা এড়ান।
- গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা কতদিন থাকে?
সাধারণত প্রসবের কিছু সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মধ্যে ব্যথা কমে আসে। কারও ক্ষেত্রে একটু বেশি সময়ও লাগতে পারে।
- গর্ভাবস্থায় পিঠে ব্যথা কি সাধারণ সমস্যা?
হ্যাঁ, এটি খুবই সাধারণ। বেশিরভাগ মায়ের মধ্যেই কমবেশি দেখা যায়, আর সঠিক যত্নে তা সামলানো সম্ভব।
To know more
Birla Fertility & IVF aims at transforming the future of fertility globally, through outstanding clinical outcomes, research, innovation and compassionate care.
Had an IVF Failure?
Talk to our fertility experts