Trust img
Select City
কীভাবে গর্ভধারণ করবেন – How To Conceive in Bengali

কীভাবে গর্ভধারণ করবেন – How To Conceive in Bengali

doctor image
Dr. Sreeparna Roy

MBBS, MS (Obstetrics and Gynaecology), Diploma in Reproductive Medicine (Germany)

3+ Years of experience

Table of Contents

সন্তান নেওয়া লক্ষ লক্ষ দম্পতির স্বপ্ন। কারও ক্ষেত্রে গর্ভধারণ খুব সহজেই হয়ে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে তা কিছুটা সময় নেয়। কেউ নতুন সংসার শুরু করতে চাইছেন, কেউ আবার দ্বিতীয় সন্তানের পরিকল্পনা করছেন।

এক বছর ধরে চেষ্টা করেও সাফল্য না এলে দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। তবে ভয়ের কিছু নেই। গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ আপনি নিজেই নিতে পারেন।

এই গাইডে আমরা জানব দ্রুত গর্ভবতী হওয়ার উপায়, ডিম্বস্ফোটন কীভাবে চিনবেন, কোন সময়ে সহবাস করলে সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, কী কী এড়িয়ে চলবেন এবং ঠিক কখন একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এক নজরে: সুস্থ দম্পতির ক্ষেত্রে প্রতি মাসে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ২০–২৫%। ৮৫% দম্পতি এক বছরের মধ্যে সফল হন। উর্বর সময়ে, অর্থাৎ ডিম্বস্ফোটনের ঠিক আগের ৫ দিন ও ডিম্বস্ফোটনের দিনে, নিয়মিত সহবাসই সম্ভাবনা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় উপায়।

গর্ভধারণ কী এবং কীভাবে হয়?

পুরুষের শুক্রাণু যোনিপথ দিয়ে জরায়ুতে প্রবেশ করে ফ্যালোপিয়ান টিউবে (ডিম্বনালী) থাকা ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করলে গর্ভধারণ শুরু হয়।

নিষিক্ত ডিম্বাণুটি এরপর বিভাজিত হয়ে বহু কোষে পরিণত হয় এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব বেয়ে জরায়ুতে পৌঁছয়। সেখানে জরায়ুর ভিতরের আস্তরণে (এন্ডোমেট্রিয়াম) এটি গেঁথে বসে বা বাসা বাঁধে এবং ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় গর্ভধারণ বা কনসেপশন।

এখানে সময়ের হিসেবটা খুব গুরুত্বপূর্ণ:

  • ডিম্বস্ফোটনের পর ডিম্বাণু মাত্র ১২–২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকে।
  • কিন্তু শুক্রাণু নারীর শরীরে ৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

অর্থাৎ, ডিম্বস্ফোটনের কয়েক দিন আগে সহবাস করলেও গর্ভধারণ সম্ভব, কারণ শুক্রাণু আগে থেকেই অপেক্ষায় থাকে। এই কারণেই ডিম্বস্ফোটনের সময় জানা এত জরুরি।

ডিম্বস্ফোটন কী? কীভাবে বুঝবেন?

ডিম্বস্ফোটন (Ovulation) হল মাসিক চক্রের সেই পর্যায়, যখন ডিম্বাশয় থেকে একটি পরিণত ডিম্বাণু বেরিয়ে আসে। প্রতি মাসে ডিম্বাশয়ের ভিতরে তরলে ভরা ছোট থলিতে (ফলিকল) একগুচ্ছ ডিম্বাণু বাড়তে থাকে। পরবর্তী মাসিক শুরুর প্রায় ১৪ দিন আগে এর মধ্যে একটি ফলিকল ফেটে ডিম্বাণুটি বেরিয়ে আসে।

২৮ দিনের চক্র হলে সাধারণত ১৪তম দিনে ডিম্বস্ফোটন হয়। তবে সব মহিলার চক্র ২৮ দিনের হয় না। কারও ২৪ দিন, কারও আবার ৩৫ দিনও হতে পারে। সেক্ষেত্রে হিসেবটা এভাবে করুন:

ডিম্বস্ফোটনের আনুমানিক দিন = চক্রের মোট দিন − ১৪

মাসিক চক্রের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ডিম্বস্ফোটনের দিন উর্বর সময় (চক্রের দিন)
২৬ দিন ১২তম দিন ৭–১৩
২৮ দিন ১৪তম দিন ৯–১৫
৩০ দিন ১৬তম দিন ১১–১৭
৩২ দিন ১৮তম দিন ১৩–১৯

(চক্রের প্রথম দিন = মাসিক শুরুর প্রথম দিন)

ডিম্বস্ফোটনের লক্ষণগুলি

মাসিকের ক্যালেন্ডার রাখার পাশাপাশি এই শারীরিক লক্ষণগুলির দিকে খেয়াল রাখুন:

  • শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে যাওয়া: ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে থার্মোমিটারে মাপলে ধরা পড়ে (সাধারণত ০.৩–০.৫° সেলসিয়াস বৃদ্ধি)। একে বলে বেসাল বডি টেম্পারেচার।
  • স্বচ্ছ, পাতলা ও পিচ্ছিল যোনিস্রাব: অনেকটা ডিমের সাদা অংশের মতো
  • লিউটিনাইজিং হরমোন (LH)-এর মাত্রা বৃদ্ধি: বাড়িতে ওভুলেশন কিট দিয়ে পরীক্ষা করা যায়
  • তলপেটে হালকা ব্যথা বা টান: একে বলে মিটেলশমার্জ বা ডিম্বস্ফোটনজনিত ব্যথা
  • স্তনে ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা
  • পেট ফাঁপা ভাব
  • হালকা রক্তের দাগ বা স্পটিং
  • যৌন ইচ্ছা বেড়ে যাওয়া

উর্বর সময় বা ফার্টাইল উইন্ডো কী?

উর্বর সময় হল মাসিক চক্রের সেই ৬টি দিন, যখন সহবাস করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে: ডিম্বস্ফোটনের আগের ৫ দিন এবং ডিম্বস্ফোটনের দিনটি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা থাকে ডিম্বস্ফোটনের ঠিক আগের ২ দিন ও ডিম্বস্ফোটনের দিনে। তাই এই সময়ে প্রতিদিন বা একদিন অন্তর সহবাস করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

দ্রুত গর্ভবতী হওয়ার ১০টি উপায়

১. আগে থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন

সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করার আগেই একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিন। এই পরীক্ষায় (প্রি-কনসেপশন চেকআপ) থাইরয়েড, ডায়াবিটিস, রক্তাল্পতা, সংক্রমণ বা অন্য কোনও লুকিয়ে থাকা সমস্যা ধরা পড়লে আগেভাগেই তার চিকিৎসা করা যায়।

ডাক্তার সাধারণত ফলিক অ্যাসিড-সহ প্রিনেটাল ভিটামিন শুরু করতে বলেন। গর্ভধারণের অন্তত ১–৩ মাস আগে থেকে দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড খেলে শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি (নিউরাল টিউব ডিফেক্ট) প্রতিরোধে সাহায্য হয়।

২. নিজের মাসিক চক্র বুঝুন

অন্তত ৩ মাস মাসিকের তারিখ লিখে রাখুন। এতে বুঝতে পারবেন আপনার চক্র নিয়মিত কি না এবং কত দিনের। এই তথ্য ছাড়া ডিম্বস্ফোটনের সঠিক সময় বার করা কঠিন।

প্রয়োজনে ওভুলেশন প্রেডিক্টর কিট ব্যবহার করুন। এটি প্রস্রাবে LH হরমোনের মাত্রা মেপে ২৪–৩৬ ঘণ্টা আগেই ডিম্বস্ফোটনের পূর্বাভাস দিতে পারে।

৩. উর্বর সময়ে নিয়মিত সহবাস করুন

গবেষণা বলছে, যাঁরা উর্বর সময়ে প্রতিদিন বা একদিন অন্তর সহবাস করেন, তাঁদের গর্ভধারণের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন সম্ভব না হলে ২–৩ দিন অন্তর সহবাস করুন। এতে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান দুটোই ভালো থাকে।

একটি বিষয় মনে রাখবেন: শুধু ডিম্বস্ফোটনের দিনের অপেক্ষায় থেকে বাকি দিনগুলি বাদ দেবেন না। এতে বরং মানসিক চাপ বাড়ে এবং সঠিক দিনটি হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

৪. সহবাসের পর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন

সহবাসের পর ১৫–২০ মিনিট শুয়ে থাকার পরামর্শ প্রচলিত আছে, যাতে শুক্রাণু জরায়ুমুখের দিকে এগোনোর সময় পায়। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব জোরালো না হলেও, এতে কোনও ক্ষতি নেই। তবে সহবাসের ঠিক পরেই বাথরুমে যাওয়া বা যোনি ধুয়ে পরিষ্কার করা (ডুশ করা) এড়িয়ে চলুন।

৫. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন

পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত জল এবং নিয়মিত হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় রাখুন:

  • শাকসবজি ও মরসুমি ফল
  • গোটা শস্য (ব্রাউন রাইস, ওটস, আটা)
  • ডাল, ছোলা, রাজমা জাতীয় উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
  • ডিম, মাছ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
  • বাদাম ও বীজ

সতর্কতা: অতিরিক্ত কঠোর ব্যায়াম মাসিক চক্র এলোমেলো করে দিতে পারে এবং উর্বরতা কমাতে পারে। তাই মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামেই থাকুন। সপ্তাহে ১৫০ মিনিটই যথেষ্ট।

৬. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

ওজন সরাসরি গর্ভধারণের সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িত। অতিরিক্ত কম ওজন বা অতিরিক্ত বেশি ওজন, দুটোই সমস্যা তৈরি করে।

  • কম ওজনের মহিলাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন না-ও হতে পারে।
  • অতিরিক্ত ওজনের মহিলাদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে।

BMI ১৮.৫ থেকে ২৪.৯-এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। ওজন বেশি হলে মাত্র ৫–১০% ওজন কমালেই অনেক ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক হয়ে যায়।

৭. ঘুম ও মানসিক চাপ সামলান

দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ডিম্বস্ফোটনে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতি রাতে ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন। যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, ধ্যান বা হালকা হাঁটাচলা চাপ কমাতে সাহায্য করে।

৮. পুরুষ সঙ্গীর উর্বরতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ

বন্ধ্যাত্বের প্রায় ৪০–৫০% ক্ষেত্রে কারণ থাকে পুরুষের দিকে। তাই শুধু মহিলার উপর মনোযোগ না দিয়ে পুরুষ সঙ্গীরও এই বিষয়গুলি মেনে চলা উচিত:

  • ধূমপান ও মদ্যপান বন্ধ করা
  • অণ্ডকোষ অতিরিক্ত গরম হওয়া এড়ানো (দীর্ঘক্ষণ গরম জলে স্নান, সনা বাথ, কোলে ল্যাপটপ রাখা, খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস)
  • জিঙ্ক, সেলেনিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টযুক্ত খাবার খাওয়া
  • এক বছর চেষ্টার পরেও সাফল্য না এলে বীর্য পরীক্ষা (সিমেন অ্যানালাইসিস) করানো

৯. সম্ভব হলে অল্প বয়সে পরিকল্পনা করুন

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান দুটোই কমতে থাকে। বয়স বাড়লে এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর ফাইব্রয়েডের মতো সমস্যার আশঙ্কাও বাড়ে।

বয়স প্রতি মাসে স্বাভাবিক গর্ভধারণের আনুমানিক সম্ভাবনা
২০–২৪ বছর ২৫%
২৫–২৯ বছর ২০–২৫%
৩০–৩৪ বছর ১৫–২০%
৩৫–৩৯ বছর ১০%
৪০ বছরের বেশি ৫% বা তার কম

সম্ভব হলে ২০ থেকে ৩০-এর গোড়ার দিকেই সন্তানের পরিকল্পনা করুন। পরে পরিকল্পনা থাকলে ডিম্বাণু সংরক্ষণ (এগ ফ্রিজিং) নিয়ে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।

১০. লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারে সতর্ক থাকুন

সাধারণ অনেক লুব্রিক্যান্ট শুক্রাণুর চলাচলে বাধা দেয়। প্রয়োজন হলে “ফার্টিলিটি-ফ্রেন্ডলি” বা স্পার্ম-ফ্রেন্ডলি লেখা লুব্রিক্যান্ট বেছে নিন।

গর্ভধারণের জন্য উপকারী খাবার

খাবার একা গর্ভধারণ নিশ্চিত করতে পারে না, তবে সঠিক পুষ্টি হরমোনের ভারসাম্য, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর গুণমান এবং জরায়ুর আস্তরণ, এই তিনটিকেই সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, ভূমধ্যসাগরীয় ধরনের খাদ্যাভ্যাস (প্রচুর সবজি, গোটা শস্য, ডাল, মাছ ও স্বাস্থ্যকর তেল) উর্বরতার জন্য সবচেয়ে উপকারী।

পুষ্টি উপাদান কেন প্রয়োজন কোন খাবারে পাবেন
ফলিক অ্যাসিড শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি প্রতিরোধ করে পালং শাক, মেথি শাক, ব্রকোলি, ডাল, কমলালেবু
আয়রন রক্তাল্পতা রোধ করে, ডিম্বস্ফোটনে সহায়তা করে কচু শাক, বিট, খেজুর, ডালিম, কলিজা
ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড হরমোনের ভারসাম্য ও রক্তসঞ্চালন উন্নত করে ইলিশ, রুই, সার্ডিন, আখরোট, তিসির বীজ
জিঙ্ক শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতিশীলতা বাড়ায় কুমড়োর বীজ, কাজু, ছোলা, ডিম
ভিটামিন ডি ডিম্বস্ফোটন ও ইমপ্ল্যান্টেশনে ভূমিকা রাখে রোদ, ডিমের কুসুম, মাশরুম, দুধ
অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায় আমলকী, পেয়ারা, বেরি, টমেটো, গ্রিন টি
উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ডিম্বস্ফোটনজনিত বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি কমায় ডাল, রাজমা, ছোলা, সয়াবিন

যেসব খাবার সীমিত রাখবেন

  • অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও ট্রান্স ফ্যাট: ভাজাভুজি, প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, বেকারির খাবার
  • অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়: ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ায়, বিশেষত পিসিওএস থাকলে
  • উচ্চ পারদযুক্ত বড় সামুদ্রিক মাছ: যেমন কিং ম্যাকরেল, সোর্ডফিশ
  • কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাছ, মাংস ও ডিম: সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে

দ্রুত গর্ভবতী হতে চাইলে কী কী এড়িয়ে চলবেন

ধূমপান ছাড়ুন। তামাক নারী ও পুরুষ উভয়ের উর্বরতাই কমিয়ে দেয়। মহিলাদের ডিম্বাণুর সংখ্যা কমায় এবং পুরুষদের শুক্রাণুর গুণমান নষ্ট করে। গর্ভধারণের চেষ্টা শুরুর আগেই ধূমপান বন্ধ করুন। পরোক্ষ ধূমপানও এড়িয়ে চলুন।

মদ্যপান বন্ধ করুন। অতিরিক্ত মদ্যপান উর্বরতা কমায় এবং গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে শিশুর ক্ষতি করতে পারে। গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে মদ্যপান সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়াই নিরাপদ।

ক্যাফেইন সীমিত রাখুন। অল্প পরিমাণ ক্যাফেইনে সমস্যা নেই, তবে দিনে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি নয়, অর্থাৎ মোটামুটি ১–২ কাপ কফি। চা, কোল্ড ড্রিঙ্ক ও এনার্জি ড্রিঙ্কেও ক্যাফেইন থাকে, সেটাও হিসেবে ধরুন।

অতিরিক্ত কঠোর ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন। মাঝারি ব্যায়াম উপকারী হলেও অত্যধিক কঠোর ব্যায়াম মাসিক চক্র বন্ধ করে দিতে পারে এবং গর্ভধারণে বাধা তৈরি করে।

নিজে থেকে ওষুধ খাবেন না। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনও হরমোনাল বা উর্বরতা বাড়ানোর ওষুধ খাবেন না। ব্যথার কিছু ওষুধ (NSAID) দীর্ঘদিন খেলে ডিম্বস্ফোটনে প্রভাব পড়তে পারে।

পিসিওএস থাকলে কীভাবে গর্ভবতী হবেন?

পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) একটি হরমোনজনিত সমস্যা, যা মহিলাদের উর্বরতাকে প্রভাবিত করে। পিসিওএস থাকলে ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হয় বা কখনও কখনও একেবারেই হয় না, তাই গর্ভধারণে বেশি সময় লাগতে পারে।

তবে পিসিওএস মানেই গর্ভধারণ অসম্ভব নয়। যা সাহায্য করে:

  • ওজন নিয়ন্ত্রণ: মাত্র ৫–১০% ওজন কমালেই অনেকের ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক হয়ে যায়
  • ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণ: কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে
  • ডিম্বস্ফোটন শুরু করার ওষুধ (যেমন লেট্রোজল বা ক্লোমিফেন সাইট্রেট), শুধুমাত্র ডাক্তারের পরামর্শে
  • প্রয়োজনে IUI বা IVF-এর মতো চিকিৎসা

পিসিওএস থাকলে এবং স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ না হলে দেরি না করে একজন ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

গর্ভধারণের প্রাথমিক লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন?

নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুতে গেঁথে বসার (ইমপ্ল্যান্টেশন) পর শরীরে hCG হরমোন তৈরি হতে শুরু করে, আর তখন থেকেই প্রাথমিক লক্ষণগুলি দেখা দিতে পারে। সাধারণত সহবাসের ১০–১৪ দিন পর থেকে:

  • মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া: সবচেয়ে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য লক্ষণ
  • হালকা স্পটিং বা ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং: মাসিকের চেয়ে অনেক কম, ৬–১২ দিনের মাথায়
  • স্তনে ব্যথা, ভার ভাব বা স্পর্শকাতরতা
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম ভাব
  • বমি বমি ভাব বা মর্নিং সিকনেস, যদিও এটি দিনের যেকোনও সময়েই হতে পারে
  • ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
  • কোনও গন্ধ বা খাবারে হঠাৎ অরুচি বা আসক্তি
  • মেজাজের ওঠানামা ও হালকা মাথা ঘোরা

প্রেগন্যান্সি টেস্ট কখন করবেন?

মাসিকের নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার অন্তত এক দিন পর বাড়িতে ইউরিন প্রেগন্যান্সি টেস্ট করুন। খুব তাড়াতাড়ি পরীক্ষা করলে hCG-এর মাত্রা কম থাকায় ভুলভাবে নেগেটিভ ফল আসতে পারে। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফলের জন্য সকালের প্রথম প্রস্রাব ব্যবহার করুন।

ফল নেগেটিভ এলেও মাসিক না হলে এক সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা করুন, অথবা রক্তের বিটা-hCG পরীক্ষা করান। এটি অনেক আগেই গর্ভধারণ ধরতে পারে।

গর্ভধারণ নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা ও সত্য

প্রচলিত ধারণা আসল সত্য
সহবাসের পর নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে শুয়ে থাকলে ছেলে বা মেয়ে হয় শিশুর লিঙ্গ নির্ধারিত হয় শুক্রাণুর ক্রোমোজোম দিয়ে; ভঙ্গির কোনও ভূমিকা নেই
প্রতিদিন সহবাস করলে শুক্রাণু “দুর্বল” হয়ে যায় উর্বর সময়ে প্রতিদিন সহবাসে গর্ভধারণের হার বরং বেশি
বন্ধ্যাত্ব শুধু মহিলাদের সমস্যা প্রায় ৪০–৫০% ক্ষেত্রে কারণ থাকে পুরুষের দিকে
একবার গর্ভপাত হলে আর সন্তান হবে না একবার গর্ভপাতের পরেও বেশিরভাগ মহিলার পরবর্তী গর্ভধারণ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়
মাসিক নিয়মিত মানেই কোনও সমস্যা নেই নিয়মিত মাসিকের সঙ্গেও টিউব বন্ধ থাকা বা এন্ডোমেট্রিওসিসের মতো সমস্যা থাকতে পারে
IVF মানেই শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা অনেক ক্ষেত্রেই IVF প্রথম দিকের সঠিক সিদ্ধান্ত, যেমন টিউব বন্ধ থাকলে বা বয়স বেশি হলে
মানসিক চাপ না নিলেই গর্ভধারণ হয়ে যাবে চাপ কমানো উপকারী, কিন্তু শারীরিক কারণ থাকলে তা চিকিৎসা ছাড়া সারে না

বন্ধ্যাত্বের সাধারণ কারণ

এক বছর চেষ্টার পরেও গর্ভধারণ না হলে সাধারণত এই কারণগুলি খতিয়ে দেখা হয়:

মহিলাদের ক্ষেত্রে

  • ডিম্বস্ফোটনজনিত সমস্যা: পিসিওএস, থাইরয়েডের গোলমাল, উচ্চ প্রোল্যাকটিন
  • ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত থাকা: প্রায়ই আগের কোনও সংক্রমণের কারণে
  • এন্ডোমেট্রিওসিস
  • জরায়ুর ফাইব্রয়েড বা পলিপ
  • বয়সজনিত কারণে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান হ্রাস (কম ওভারিয়ান রিজার্ভ)

পুরুষদের ক্ষেত্রে

  • শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া বা একেবারে না থাকা
  • শুক্রাণুর গতিশীলতা বা গঠনগত সমস্যা
  • ভ্যারিকোসিল
  • হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা সংক্রমণ

প্রায় ১০–১৫% ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা স্বাভাবিক আসার পরেও নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না। একে বলা হয় আনএক্সপ্লেইনড ইনফার্টিলিটি বা অব্যাখ্যাত বন্ধ্যাত্ব। এক্ষেত্রেও চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?

সময়মতো পরামর্শ নেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিচের যেকোনও একটি ক্ষেত্রে দেরি করবেন না:

পরিস্থিতি কখন বিশেষজ্ঞ দেখাবেন
বয়স ৩৫ বছরের কম ১২ মাস নিয়মিত চেষ্টার পরেও গর্ভধারণ না হলে
বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি ৬ মাস চেষ্টার পরেই
বয়স ৪০ বছরের বেশি চেষ্টা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই
অনিয়মিত বা বন্ধ মাসিক সঙ্গে সঙ্গে
পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস বা ফাইব্রয়েড আছে পরিকল্পনার শুরুতেই
দু’বার বা তার বেশি গর্ভপাত হয়েছে সঙ্গে সঙ্গে
আগে পেলভিক সার্জারি, সংক্রমণ বা কেমোথেরাপি হয়েছে পরিকল্পনার শুরুতেই

উপসংহার

সন্তান নেওয়ার চেষ্টা কারও কারও কাছে যেমন আনন্দের, তেমনই কিছুটা চাপেরও হতে পারে। নিজের মাসিক চক্র বোঝা, উর্বর সময়ে নিয়মিত সহবাস, স্বাস্থ্যকর ওজন ও জীবনযাপন, এই কয়েকটি পদক্ষেপই বেশিরভাগ দম্পতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট।

তবে এক বছর (৩৫ বছরের বেশি বয়সে ছয় মাস) চেষ্টার পরেও সাফল্য না এলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আধুনিক ফার্টিলিটি চিকিৎসার সাহায্যে আজ বহু দম্পতিই বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করছেন।

উন্নত ফার্টিলিটি চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে বিড়লা ফার্টিলিটি ও IVF-এর নিকটতম কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন অথবা অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন।

কেন আমাদের বেছে নেবেন?

১২০+ IVF বিশেষজ্ঞ
৯৫% সন্তুষ্টির স্কোর
৫০+ সারা ভারতে ক্লিনিক
১,৪০,০০০+ দম্পতিকে সহায়তা

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

দ্রুত গর্ভবতী হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?

ডিম্বস্ফোটনের আগের ৫ দিন ও ডিম্বস্ফোটনের দিন, এই উর্বর সময়ে প্রতিদিন বা একদিন অন্তর সহবাস করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি ফলিক অ্যাসিড-সহ প্রিনেটাল ভিটামিন নিন, পর্যাপ্ত ঘুমান এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।

আমি কীভাবে বুঝব যে আমার ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে?

মাসিকের হিসেব রাখুন বা বাড়িতে ওভুলেশন কিট ব্যবহার করুন। ২৮ দিনের নিয়মিত চক্র হলে সাধারণত ১৪তম দিনে ডিম্বস্ফোটন হয়। এছাড়া ডিমের সাদা অংশের মতো পিচ্ছিল যোনিস্রাব, তলপেটে হালকা ব্যথা ও শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বেড়ে যাওয়া, এগুলিও ডিম্বস্ফোটনের লক্ষণ।

সহবাসের কত দিন পর গর্ভধারণ নিশ্চিত হয়?

নিষিক্ত ডিম্বাণু জরায়ুতে গেঁথে বসতে ৬–১২ দিন সময় লাগে। মাসিক বন্ধ হওয়ার পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়া যায়, অর্থাৎ সহবাসের প্রায় ২ সপ্তাহ পর।

ভালো উর্বরতার লক্ষণ কী কী?

নিয়মিত ২৮ দিনের মাসিক চক্র ও স্বাভাবিক রক্তক্ষরণ ভালো উর্বরতার একটি বড় ইঙ্গিত। এর সঙ্গে সুস্থ শরীর, পর্যাপ্ত কর্মশক্তি, স্বাভাবিক ওজন এবং হরমোনের ভারসাম্যও ভালো প্রজনন স্বাস্থ্যের লক্ষণ।

গর্ভধারণের সম্ভাবনা কীভাবে বাড়ানো যায়?

উর্বর সময়ে নিয়মিত সহবাস করুন, ফলিক অ্যাসিড খান, ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করুন, ক্যাফেইন দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং মাঝারি মাত্রায় ব্যায়াম করুন। শারীরিক ও মানসিক, দুই স্বাস্থ্যেরই যত্ন নিন।

পিসিওএস থাকলে কি স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব?

হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব। ওজন নিয়ন্ত্রণ, ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনলে অনেকের ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাতেও না হলে ডাক্তারের পরামর্শে ডিম্বস্ফোটন শুরু করার ওষুধ বা IUI/IVF-এর মতো চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।

দিনের কোন সময়ে সহবাস করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বেশি?

দিনের নির্দিষ্ট কোনও সময়ের সঙ্গে গর্ভধারণের সম্পর্ক প্রমাণিত নয়। সময়ের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল মাসিক চক্রের কোন দিনে সহবাস হচ্ছে। উর্বর সময়ের মধ্যে হলেই সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

গর্ভধারণের কতদিন পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করা উচিত?

মাসিকের নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার অন্তত এক দিন পর বাড়িতে ইউরিন টেস্ট করুন এবং সকালের প্রথম প্রস্রাব ব্যবহার করুন। এর আগে পরীক্ষা করলে hCG হরমোনের মাত্রা কম থাকায় ভুল নেগেটিভ ফল আসতে পারে। রক্তের বিটা-hCG পরীক্ষা আরও আগেই গর্ভধারণ ধরতে পারে।

গর্ভধারণের চেষ্টার সময় কি প্রতিদিন সহবাস করা ঠিক?

হ্যাঁ। উর্বর সময়ে প্রতিদিন সহবাস করলে গর্ভধারণের হার সবচেয়ে বেশি থাকে। প্রতিদিন সহবাসে শুক্রাণু দুর্বল হয়ে যায়, এই ধারণাটি ভুল। তবে প্রতিদিন সম্ভব না হলে একদিন বা দু’দিন অন্তর সহবাসেও সমান ভালো ফল পাওয়া যায়।

এক বছর চেষ্টা করেও গর্ভধারণ না হলে কী করব?

৩৫ বছরের কম বয়সে ১২ মাস এবং ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সে ৬ মাস নিয়মিত চেষ্টার পরেও গর্ভধারণ না হলে একজন ফার্টিলিটি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সাধারণত মহিলার হরমোন ও আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা এবং পুরুষ সঙ্গীর বীর্য পরীক্ষা (সিমেন অ্যানালাইসিস) দিয়ে মূল্যায়ন শুরু হয়।

To know more

Birla Fertility & IVF aims at transforming the future of fertility globally, through outstanding clinical outcomes, research, innovation and compassionate care.

Need Help?

Talk to our fertility experts

Had an IVF Failure?

Talk to our fertility experts