
গর্ভাবস্থায় পিরিয়ড হয় কি? রক্তপাতের কারণ ও করণীয়

গর্ভধারণের পর হঠাৎ রক্তপাত দেখা দিলে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। এ অবস্থায় মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, “গর্ভাবস্থায় কি তবে পিরিয়ড হচ্ছে?” প্রকৃতপক্ষে, গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক মাসিক বা পিরিয়ড হয় না। তবে বিভিন্ন কারণে রক্তপাত বা স্পটিং হতে পারে, যার সবকটি বিপজ্জনক নয়। রক্তপাতের সম্ভাব্য কারণসমূহ এবং কোন ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে নিচে বিশদ আলোচনা করা হলো।
গর্ভাবস্থায় সামান্য রক্তপাত বা স্পটিং দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকা জরুরি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সময়মতো সঠিক স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমে যেকোনো জটিলতা এড়ানো সম্ভব। তাই যেকোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতামত নেওয়া উচিত, যা মা ও শিশু দুজনের সুরক্ষাই নিশ্চিত করে।
গর্ভাবস্থায় কি পিরিয়ড হয়?
না, গর্ভাবস্থায় সত্যিকারের মাসিক হয় না। গর্ভ ধারণের পর ডিম্বাশয়ে নতুন ডিম্বাণু তৈরি বন্ধ থাকে, আর জরায়ুর ভেতরের স্তর শিশুর জন্য ধরে রাখা হয়। ফলেমাসিক চক্রের স্বাভাবিক ধাপগুলো থেমে যায়। আরমাসিকের কত দিন পর গর্ভধারণ সম্ভব, সেটা আলাদা একটা প্রশ্ন। গর্ভাবস্থায় যেটাকে পিরিয়ড বলে মনে হয়, সেটা আসলে অন্য কোনও কারণে হওয়া রক্তপাত।
গর্ভাবস্থায় কি পিরিয়ডের মতো রক্তপাত হতে পারে?
পারে। প্রথম ত্রৈমাসিকে প্রতি পাঁচজনে একজনের কাছাকাছি মায়ের কিছু না কিছু রক্তপাত হয়। কারও শুধু গোলাপি বা বাদামি দাগ, কারও আবার মাসিকের প্রথম দিনের মতো লালচে রক্ত। দেখতে এক রকম হলেও কারণ একেবারেই আলাদা।
একটা মজার, আবার একটু ভাবনার কথাও আছে। অনেক সময় রক্তপাত এত হালকা হয় যে কেউ কেউ বুঝতেই পারেন না তিনি গর্ভবতী। মাসিক এসেছে ধরে নেন, আর কয়েক সপ্তাহ পরে অন্য লক্ষণ দেখে সন্দেহ জাগে। তাই মাসিকের তারিখ বদলে গেলে বা স্বাভাবিকের চেয়ে হালকা হলে একবার প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে নেওয়া ভালো। খুব শুরুতে হওয়া গর্ভপাত বাকেমিক্যাল প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রেও এমন রক্তপাত হয়।
গর্ভাবস্থায় রক্তপাত কতটা স্বাভাবিক?
শুরুর দিকে হালকা স্পটিং তুলনামূলক চেনা ঘটনা, আর অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থা ঠিকঠাক এগোয়। কিন্তু “চেনা” মানে “অবহেলা করার মতো” নয়। রক্ত যত বাড়ে, বা সঙ্গে ব্যথা যত তীব্র হয়, চিন্তার কারণও তত বাড়ে। আর দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে যে কোনও রক্তপাত ডাক্তারকে জানানো উচিত।
অনেকে ভাবেন, রক্ত দেখা মানেই সব শেষ। বাস্তবে তা নয়। হালকা রক্তপাতের পরেও বহু মা পুরো সময় সুস্থভাবে গর্ভাবস্থা কাটিয়ে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন। তাই ঘাবড়ে না গিয়ে শান্ত থাকুন, তবে বিষয়টা এড়িয়েও যাবেন না।
প্রথম কয়েক মাসে রক্তপাতের কারণ
সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো এই:
- ইমপ্লান্টেশন ব্লিডিং: নিষেকের ৬ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ডিম্বাণু জরায়ুর গায়ে বসে, তখন এক-দু’দিন হালকা গোলাপি বা বাদামি দাগ দেখা যায়।
- জরায়ুমুখের পরিবর্তন। গর্ভাবস্থায় সেখানে রক্ত চলাচল বাড়ে, জায়গাটা নরম হয়ে যায়। সহবাস বা ভেতরের পরীক্ষার পর সামান্য রক্ত বেরোতে পারে।
- সাবকোরিয়োনিক হেমাটোমা। ভ্রূণের ঝিল্লি আর জরায়ুর দেয়ালের মাঝে সামান্য রক্ত জমে। আল্ট্রাসাউন্ডে ধরা পড়ে, অনেক সময় নিজেই মিলিয়ে যায়।
- সংক্রমণ বা জরায়ুমুখের পলিপ।
- গুরুতর কারণ:গর্ভপাত,এক্টোপিক গর্ভাবস্থা বামোলার গর্ভাবস্থা।
পিরিয়ড আর গর্ভাবস্থার রক্তপাতের তফাত কী?
মোটামুটি এভাবে আলাদা করা যায়:
- রং: মাসিকের রক্ত সাধারণত গাঢ় লাল। গর্ভাবস্থার স্পটিং বেশির ভাগ সময় গোলাপি বা বাদামি।
- পরিমাণ: মাসিকে প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়ে। স্পটিং খুব অল্প, প্যাড ভেজে না।
- সময়: মাসিক চার থেকে সাত দিন চলে। ইমপ্লান্টেশনের দাগ এক-দু’দিনেই শেষ।
- ব্যথা: মাসিকের ব্যথা আপনার চেনা ধাঁচের। গর্ভাবস্থায় ব্যথা হালকা বা একপেশে হতে পারে।
তবে এগুলো পাথরে খোদাই করা নিয়ম নয়। সন্দেহ থাকলে প্রেগন্যান্সি টেস্ট করুন আর ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।
এটা কি কোনও সমস্যার লক্ষণ হতে পারে?
কখনও কখনও হ্যাঁ। রক্তের সঙ্গে তলপেটে তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা, কাঁধে ব্যথা বা চাপ চাপ রক্ত গেলে গর্ভপাত বা এক্টোপিক গর্ভাবস্থার সম্ভাবনা থাকে। শুধু একটু দাগ দেখেই ঘাবড়ে যাবেন না, কিন্তু অন্য লক্ষণ জুড়লে দেরিও করবেন না।
গর্ভাবস্থায় রক্তপাত কেন হয়?
শরীর তখন ভেতরে ভেতরে অনেক বদলাচ্ছে। জরায়ুতে রক্তনালী বাড়ছে, হরমোনের মাত্রা ওঠানামা করছে, জরায়ুমুখ নরম হচ্ছে। এর কোনওটা সামান্য ছোঁয়াতেও রক্ত ঝরাতে পারে। পরের মাসগুলোতে প্লাসেন্টা নিচে থাকা (প্লাসেন্টা প্রিভিয়া), প্লাসেন্টা সরে যাওয়া বা অকাল প্রসব বেদনার মতো কারণে রক্ত আসে। এগুলোতে জরুরি চিকিৎসা লাগে।
যোনিপথের সংক্রমণ বা যৌনবাহিত কোনও সংক্রমণ থাকলেও রক্ত বেরোতে পারে। আবার সহবাসের পরে বা ভেতরের পরীক্ষার পরে সামান্য দাগ দেখা যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়, কারণ জরায়ুমুখ তখন বেশ নরম আর সংবেদনশীল। আপনার ক্ষেত্রে ঠিক কোনটা কারণ,ভায়াবিলিটি স্ক্যান বা আল্ট্রাসাউন্ড ছাড়া সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
গর্ভাবস্থায় পিরিয়ডের মতো ব্যথা কী?
তলপেটে মাসিকের আগের মতো টান বা খিঁচুনি। জরায়ু বড় হচ্ছে, লিগামেন্টে টান পড়ছে, কখনও আবার গ্যাস বা কোষ্ঠকাঠিন্যই কারণ। হালকা ব্যথা সাধারণ। কিন্তু রক্তের সঙ্গে ব্যথা এলে সেটা আলাদা করে দেখা দরকার।
অনেকে এই ব্যথাকে মাসিকের ব্যথা ভেবে ধরে নেন “পিরিয়ড আসছে”। আসলে এটা ভ্রূণ জরায়ুতে জায়গা করে নেওয়ার চিহ্নও হতে পারে। কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে বেশি করে জল খান, ফাইবারযুক্ত খাবার রাখুন। হালকা গরম সেঁকে আরাম পেলে সেটা করতে পারেন। তবে ব্যথার ওষুধ ডাক্তারকে না জিজ্ঞেস করে খাবেন না।
কখন রক্তপাত গুরুতর?
নিচের কোনও একটা হলেও অপেক্ষা করবেন না:
- এক ঘণ্টায় একটা প্যাড ভিজে যাওয়ার মতো রক্ত
- চাপ চাপ রক্ত বা মাংসের টুকরোর মতো কিছু বেরোনো
- তীব্র তলপেটের ব্যথা
- মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভাব
- জ্বর বা কাঁপুনি
- কাঁধে ব্যথা
- দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে যে কোনও পরিমাণ রক্ত
গর্ভাবস্থায় পিরিয়ডের মতো ব্যথা কতক্ষণ থাকে?
হালকা ব্যথা সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থেকে এক-দু’দিন থাকে, বিশ্রামে কমে যায়। কিন্তু তিন-চার দিনের বেশি চললে, ক্রমশ বাড়লে বা রক্তপাতের সঙ্গে থাকলে ডাক্তার দেখান।
ব্যথা একবার কমে আবার ফিরে এলে সেটাও খেয়াল করুন। একপাশে জমে থাকা তীব্র ব্যথা, বিশেষ করে সঙ্গে রক্ত থাকলে, দেরি না করে আল্ট্রাসাউন্ড করানো দরকার।
স্পটিং আর রক্তপাত কীভাবে বুঝবেন?
স্পটিং মানে অল্প কয়েক ফোঁটা, যা টয়লেট পেপারে বা অন্তর্বাসে দাগ ফেলে, প্যাড লাগে না। রক্তপাত মানে প্রবাহ, যাতে প্যাড লাগে। একটা ছোট নোট রাখুন: কখন শুরু, রং কেমন, কত প্যাড লাগল, ব্যথা ছিল কিনা। ডাক্তারের কাছে এই তথ্য খুব কাজে দেয়। কারণ ধরতে সাধারণত আল্ট্রাসাউন্ড আর রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত বাড়িতে বিশ্রাম নিন, ভারী কাজ আর সহবাস আপাতত বন্ধ রাখুন। ট্যাম্পন নয়, শুধু প্যাড ব্যবহার করুন, যাতে রক্তের পরিমাণ বোঝা যায়। নিজে থেকে কোনও ওষুধ খাবেন না।
আইভিএফ-এর পর রক্তপাত হলে কী করবেন?
আইভিএফ-এর পর, বিশেষ করে এমব্রিও ট্রান্সফারের কয়েক দিনের মধ্যে, হালকা দাগ অনেকেরই হয়। ক্যাথেটার, প্রজেস্টেরনের ওষুধ বা ইমপ্লান্টেশন, যে কোনওটাই কারণ হতে পারে। শরীর এই সময় কেমন সাড়া দেয়, তা বুঝতেট্রান্সফারের পরের লক্ষণ জেনে রাখা কাজে দেয়।
কী করবেন? নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করবেন না, ক্লিনিককে জানান, ভারী কাজ আর সহবাস এড়িয়ে চলুন। রক্ত বেশি হলে বা ব্যথা তীব্র হলে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করুন। বিশেষজ্ঞ খুঁজছেন? বিড়লা ফার্টিলিটিরচিকিৎসকদের তালিকা দেখতে পারেন।
প্রশ্ন
প্রথম ত্রৈমাসিকে স্পটিং কি স্বাভাবিক?
হালকা স্পটিং অনেকেরই হয় আর প্রায়ই ক্ষতিকর নয়। তবু ডাক্তারকে জানিয়ে রাখা ভালো।
গর্ভাবস্থায় রক্তপাত কখন চিন্তার কারণ?
রক্ত বেশি হলে, চাপ চাপ বেরোলে, তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা বা জ্বর থাকলে।
গর্ভাবস্থায় কি পিরিয়ড হয়?
না। সত্যিকারের মাসিক গর্ভাবস্থায় বন্ধ থাকে।
গর্ভধারণের পরেও কি মাসিক হতে পারে?
মাসিক হয় না। তবে ইমপ্লান্টেশন বা অন্য কারণের রক্তপাতকে অনেকে মাসিক বলে ভুল করেন।
খিঁচুনি কি শিশুর ক্ষতি করে?
হালকা খিঁচুনি সাধারণত ক্ষতি করে না। কিন্তু ব্যথা তীব্র হলে বা রক্তের সঙ্গে এলে পরীক্ষা করানো দরকার।
গর্ভাবস্থার ১ মাসে কি পিরিয়ড হতে পারে?
না। ওই সময়ে রক্ত দেখা গেলে সেটা ইমপ্লান্টেশন বা অন্য কোনও কারণে।
গর্ভাবস্থার ২ মাসে কি পিরিয়ড হয়?
না। রক্তপাত হলে কারণ খুঁজে দেখতে ডাক্তারের কাছে যান।
গর্ভাবস্থায় কেন পিরিয়ডের মতো ব্যথা হয়?
জরায়ু বড় হওয়া, হরমোনের বদল, লিগামেন্টে টান বা গ্যাসের কারণে।
গর্ভাবস্থায় রক্তপাত কি স্বাভাবিক?
শুরুর দিকে হালকা স্পটিং প্রায়ই নিরীহ। ভারী রক্তপাত বা পরের ত্রৈমাসিকের রক্তপাত স্বাভাবিক নয়।
রক্তপাত হলে কখন ডাক্তার দেখাবেন?
রক্ত ভারী হলে, ব্যথা বা জ্বর থাকলে, চাপ চাপ রক্ত গেলে, কিংবা দ্বিতীয়-তৃতীয় ত্রৈমাসিকে যে কোনও রক্ত দেখলে। আইভিএফ-এর পর হলে আগে ক্লিনিকে জানান।
To know more
Birla Fertility & IVF aims at transforming the future of fertility globally, through outstanding clinical outcomes, research, innovation and compassionate care.
Had an IVF Failure?
Talk to our fertility experts