
কীভাবে গর্ভধারণ করবেন – How To Conceive in Bengali

সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রতিটি দম্পতির জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তগুলির একটি। কারও ক্ষেত্রে এটি দু-এক মাসেই হয়ে যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে এক বছরও লেগে যেতে পারে। দুটোই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
সমস্যা হল, বেশিরভাগ দম্পতিই জানেন না যে মাসে মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনেই গর্ভধারণ সম্ভব। সারা মাস চেষ্টা করেও যদি সেই দিনগুলি বাদ পড়ে যায়, তাহলে সাফল্য আসে না। এই লেখায় আমরা ধাপে ধাপে জানব: বাচ্চা নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী, কোন সময়ে সহবাস করলে সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, স্বামী-স্ত্রী দুজনের কী কী প্রস্তুতি দরকার এবং অনেক দিন চেষ্টা করেও বাচ্চা না হলে ঠিক কী করা উচিত।
এক নজরে উত্তর: সুস্থ দম্পতির ক্ষেত্রে বাচ্চা নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি হল: মাসিক শুরুর দিন থেকে হিসেব করে ডিম্বস্ফোটনের সময় বার করা, এবং সেই দিনের আগের ৫ দিন ও ডিম্বস্ফোটনের দিন মিলিয়ে মোট ৬ দিনের মধ্যে একদিন অন্তর সহবাস করা। ২৮ দিনের মাসিক চক্র হলে এই উর্বর সময় পড়ে চক্রের ৯ থেকে ১৫তম দিনে। প্রতি মাসে স্বাভাবিক গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় ২০–২৫%, এবং ৮৫% দম্পতি এক বছরের মধ্যে সফল হন।
বাচ্চা কিভাবে হয়? গর্ভধারণের পুরো প্রক্রিয়া
সহবাসের সময় পুরুষের বীর্যের সঙ্গে কোটি কোটি শুক্রাণু নারীর যোনিপথে প্রবেশ করে। এর মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকই জরায়ুমুখ পেরিয়ে জরায়ুতে এবং সেখান থেকে ফ্যালোপিয়ান টিউবে পৌঁছতে পারে।
অন্যদিকে, প্রতি মাসে নারীর ডিম্বাশয় থেকে একটি পরিণত ডিম্বাণু নির্গত হয় এবং সেটিও ফ্যালোপিয়ান টিউবে এসে অপেক্ষা করে। এখানেই একটি শুক্রাণু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে তাকে নিষিক্ত করে।
নিষিক্ত ডিম্বাণুটি এরপর বিভাজিত হতে হতে বহু কোষে পরিণত হয় এবং ৬ থেকে ১২ দিনের মধ্যে ফ্যালোপিয়ান টিউব বেয়ে জরায়ুতে নেমে আসে। জরায়ুর নরম আস্তরণে (এন্ডোমেট্রিয়াম) সেটি নিজেকে বসিয়ে নেয়। একে বলা হয় ইমপ্ল্যান্টেশন। এই ইমপ্ল্যান্টেশন সফল হলেই আপনি সত্যিকারের অর্থে গর্ভবতী।
কনসিভ মানে কি?
“কনসিভ” (Conceive) শব্দের বাংলা অর্থ গর্ভধারণ করা। অর্থাৎ শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে নিষেক ঘটে সেটি জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকেই কনসিভ বলা হয়। “কনসিভ করেছি” মানে গর্ভসঞ্চার হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেব: কে কতক্ষণ বাঁচে
বাচ্চা নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি বুঝতে হলে এই দুটি সংখ্যা মনে রাখা সবচেয়ে জরুরি:
- ডিম্বাণু বেঁচে থাকে মাত্র ১২–২৪ ঘণ্টা: ডিম্বস্ফোটনের পর এক দিনের মধ্যে নিষেক না হলে সেটি নষ্ট হয়ে যায়।
- শুক্রাণু বেঁচে থাকে ৫ দিন পর্যন্ত: নারীর জরায়ু ও টিউবের ভিতরে উপযুক্ত পরিবেশে শুক্রাণু বেশ কয়েক দিন সক্রিয় থাকতে পারে।
এই অসমতার কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়: ডিম্বস্ফোটনের দিন সহবাস করার চেয়ে তার আগের কয়েক দিনে সহবাস করা বেশি কার্যকর। কারণ আগে থেকেই শুক্রাণু টিউবে অপেক্ষায় থাকলে ডিম্বাণু বেরোনোমাত্র নিষেক হয়ে যেতে পারে। ডিম্বাণু বেরোনোর পর অপেক্ষা করলে হাতে থাকে মাত্র এক দিন।
বাচ্চা নেওয়ার সঠিক সময় কোনটি?
বাচ্চা নেওয়ার সঠিক সময় হল উর্বর সময় বা ফার্টাইল উইন্ডো: ডিম্বস্ফোটনের আগের ৫ দিন এবং ডিম্বস্ফোটনের দিনটি, মোট ৬ দিন। এই ৬ দিনের বাইরে সহবাস করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
ডিম্বস্ফোটন কখন হয়?
ডিম্বস্ফোটন (Ovulation) হল সেই মুহূর্ত, যখন ডিম্বাশয় থেকে পরিণত ডিম্বাণু বেরিয়ে আসে। এটি হয় পরবর্তী মাসিক শুরুর ঠিক ১৪ দিন আগে। তাই হিসেবটি সবসময় পিছন থেকে করতে হয়, সামনে থেকে নয়।
সহজ সূত্র: ডিম্বস্ফোটনের দিন = আপনার মাসিক চক্রের মোট দিন − ১৪
মাসিকের কতদিন পর সহবাস করলে সন্তান হয়?
এটিই সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন। উত্তর নির্ভর করে আপনার মাসিক চক্র কত দিনের তার উপর। চক্রের প্রথম দিন মানে মাসিক শুরু হওয়ার প্রথম দিন, মাসিক শেষ হওয়ার দিন নয়। এখানেই বেশিরভাগ মানুষ ভুল করেন।
| আপনার মাসিক চক্র | ডিম্বস্ফোটনের দিন | উর্বর সময় (সহবাসের সেরা দিন) |
| ২৪ দিন | ১০তম দিন | ৫ – ১১ |
| ২৬ দিন | ১২তম দিন | ৭ – ১৩ |
| ২৮ দিন | ১৪তম দিন | ৯ – ১৫ |
| ৩০ দিন | ১৬তম দিন | ১১ – ১৭ |
| ৩২ দিন | ১৮তম দিন | ১৩ – ১৯ |
| ৩৫ দিন | ২১তম দিন | ১৬ – ২২ |
অর্থাৎ ২৮ দিনের নিয়মিত চক্র হলে মাসিক শুরুর ৯ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে সহবাস করলে বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যেও সবচেয়ে ভালো দিন হল ডিম্বস্ফোটনের আগের দুই দিন, অর্থাৎ ১২ ও ১৩তম দিন।
মাসিক অনিয়মিত হলে কী করবেন?
চক্র যদি প্রতি মাসে আলাদা হয়, তাহলে ক্যালেন্ডারের হিসেব কাজ করবে না। সেক্ষেত্রে অন্তত ৩–৬ মাস মাসিকের তারিখ লিখে রাখুন এবং সবচেয়ে ছোট চক্র ধরে হিসেব করুন। তার সঙ্গে ওভুলেশন কিট বা শারীরিক লক্ষণের উপর নির্ভর করাই ভালো। মাসিক ২১ দিনের কম বা ৩৫ দিনের বেশি হলে, কিংবা মাঝে মাঝে একেবারে বন্ধ থাকলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান। এটি পিসিওএস বা থাইরয়েডের লক্ষণ হতে পারে।
ডিম্বস্ফোটনের লক্ষণ: শরীর নিজেই জানিয়ে দেয়
ক্যালেন্ডারের পাশাপাশি এই লক্ষণগুলি খেয়াল করুন:
- স্বচ্ছ, পিচ্ছিল ও টানটান যোনিস্রাব: দেখতে অনেকটা কাঁচা ডিমের সাদা অংশের মতো। এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঘরোয়া লক্ষণ।
- তলপেটের একদিকে হালকা ব্যথা বা টান: একে বলে মিটেলশমার্জ, সাধারণত কয়েক ঘণ্টা থাকে।
- শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি: ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মাপলে ০.৩–০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি পাওয়া যায়। তবে এটি ডিম্বস্ফোটন হয়ে যাওয়ার পর বোঝায়, আগে নয়।
- স্তনে ব্যথা বা স্পর্শকাতরতা
- পেট ফাঁপা ভাব ও হালকা স্পটিং
- যৌন ইচ্ছা বেড়ে যাওয়া: এটি প্রকৃতিরই ব্যবস্থা।
ওভুলেশন কিট কীভাবে ব্যবহার করবেন?
ওভুলেশন প্রেডিক্টর কিট প্রস্রাবে LH হরমোনের মাত্রা মাপে। LH বেড়ে যাওয়ার ২৪–৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ডিম্বস্ফোটন হয়। চক্রের ১০তম দিন থেকে রোজ একই সময়ে (দুপুরের দিকে সবচেয়ে ভালো) পরীক্ষা করুন। কিটে দুটি দাগ সমান গাঢ় হলেই বুঝবেন পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা আপনার সেরা সময়। সেই দুই দিন অবশ্যই সহবাস করুন।
বিয়ের পর কিভাবে বাচ্চা নিতে হয়? বাসর রাতে কি করলে বাচ্চা হয়?
অনেকেই মনে করেন বিয়ের রাতে সহবাস করলেই গর্ভধারণ হয়ে যাবে। বাস্তবে বিয়ের তারিখের সঙ্গে গর্ভধারণের কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পর্কটি সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর মাসিক চক্রের সঙ্গে। বাসর রাত যদি উর্বর সময়ের মধ্যে পড়ে, তবেই সম্ভাবনা থাকে; না পড়লে যতবারই সহবাস হোক, গর্ভধারণ হবে না।
বিয়ের পর সন্তানের পরিকল্পনা থাকলে যা করবেন:
- স্ত্রীর মাসিকের তারিখ লিখে রাখা শুরু করুন প্রথম মাস থেকেই
- বিয়ের অন্তত ১–৩ মাস আগে থেকে স্ত্রীর ফলিক অ্যাসিড শুরু করা আদর্শ
- দুজনেই একবার প্রি-কনসেপশন চেকআপ করিয়ে নিন
- প্রথম কয়েক মাসে ফল না এলে অস্থির হবেন না। এটি একেবারেই স্বাভাবিক
দ্রুত গর্ভবতী হওয়ার ১০টি উপায়
১. আগে থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিন
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করার আগেই একবার ডাক্তার দেখিয়ে নিন। এই পরীক্ষায় (প্রি-কনসেপশন চেকআপ) থাইরয়েড, ডায়াবিটিস, রক্তাল্পতা, সংক্রমণ বা অন্য কোনও লুকিয়ে থাকা সমস্যা ধরা পড়লে আগেভাগেই তার চিকিৎসা করা যায়।
ডাক্তার সাধারণত ফলিক অ্যাসিড-সহ প্রিনেটাল ভিটামিন শুরু করতে বলেন। গর্ভধারণের অন্তত ১–৩ মাস আগে থেকে দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড খেলে শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের গঠনগত ত্রুটি (নিউরাল টিউব ডিফেক্ট) প্রতিরোধে সাহায্য হয়।
২. নিজের মাসিক চক্র বুঝুন
অন্তত ৩ মাস মাসিকের তারিখ লিখে রাখুন। এতে বুঝতে পারবেন আপনার চক্র নিয়মিত কি না এবং কত দিনের। এই তথ্য ছাড়া ডিম্বস্ফোটনের সঠিক সময় বার করা কঠিন।
প্রয়োজনে ওভুলেশন প্রেডিক্টর কিট ব্যবহার করুন। এটি প্রস্রাবে LH হরমোনের মাত্রা মেপে ২৪–৩৬ ঘণ্টা আগেই ডিম্বস্ফোটনের পূর্বাভাস দিতে পারে।
৩. উর্বর সময়ে নিয়মিত সহবাস করুন
গবেষণা বলছে, যাঁরা উর্বর সময়ে প্রতিদিন বা একদিন অন্তর সহবাস করেন, তাঁদের গর্ভধারণের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন সম্ভব না হলে ২–৩ দিন অন্তর সহবাস করুন। এতে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান দুটোই ভালো থাকে।
একটি বিষয় মনে রাখবেন: শুধু ডিম্বস্ফোটনের দিনের অপেক্ষায় থেকে বাকি দিনগুলি বাদ দেবেন না। এতে বরং মানসিক চাপ বাড়ে এবং সঠিক দিনটি হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৪. সহবাসের পর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন
সহবাসের পর ১৫–২০ মিনিট শুয়ে থাকার পরামর্শ প্রচলিত আছে, যাতে শুক্রাণু জরায়ুমুখের দিকে এগোনোর সময় পায়। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব জোরালো না হলেও, এতে কোনও ক্ষতি নেই। তবে সহবাসের ঠিক পরেই বাথরুমে যাওয়া বা যোনি ধুয়ে পরিষ্কার করা (ডুশ করা) এড়িয়ে চলুন।
৫. স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন
পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত জল এবং নিয়মিত হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে। খাদ্যতালিকায় রাখুন:
- শাকসবজি ও মরসুমি ফল
- গোটা শস্য (ব্রাউন রাইস, ওটস, আটা)
- ডাল, ছোলা, রাজমা জাতীয় উদ্ভিজ্জ প্রোটিন
- ডিম, মাছ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার
- বাদাম ও বীজ
সতর্কতা: অতিরিক্ত কঠোর ব্যায়াম মাসিক চক্র এলোমেলো করে দিতে পারে এবং উর্বরতা কমাতে পারে। তাই মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামেই থাকুন। সপ্তাহে ১৫০ মিনিটই যথেষ্ট।
৬. শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ওজন সরাসরি গর্ভধারণের সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িত। অতিরিক্ত কম ওজন বা অতিরিক্ত বেশি ওজন, দুটোই সমস্যা তৈরি করে।
- কম ওজনের মহিলাদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ডিম্বস্ফোটন না-ও হতে পারে।
- অতিরিক্ত ওজনের মহিলাদের শরীরে ইস্ট্রোজেনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং গর্ভাবস্থায় জটিলতার ঝুঁকিও বেশি থাকে।
BMI ১৮.৫ থেকে ২৪.৯-এর মধ্যে রাখার চেষ্টা করুন। ওজন বেশি হলে মাত্র ৫–১০% ওজন কমালেই অনেক ক্ষেত্রে ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক হয়ে যায়।
৭. ঘুম ও মানসিক চাপ সামলান
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে ডিম্বস্ফোটনে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতি রাতে ৭–৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন। যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম, ধ্যান বা হালকা হাঁটাচলা চাপ কমাতে সাহায্য করে।
৮. পুরুষ সঙ্গীর উর্বরতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ
বন্ধ্যাত্বের প্রায় ৪০–৫০% ক্ষেত্রে কারণ থাকে পুরুষের দিকে। তাই শুধু মহিলার উপর মনোযোগ না দিয়ে পুরুষ সঙ্গীরও এই বিষয়গুলি মেনে চলা উচিত:
- ধূমপান ও মদ্যপান বন্ধ করা
- অণ্ডকোষ অতিরিক্ত গরম হওয়া এড়ানো (দীর্ঘক্ষণ গরম জলে স্নান, সনা বাথ, কোলে ল্যাপটপ রাখা, খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস)
- জিঙ্ক, সেলেনিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টযুক্ত খাবার খাওয়া
- এক বছর চেষ্টার পরেও সাফল্য না এলে বীর্য পরীক্ষা (সিমেন অ্যানালাইসিস) করানো
৯. সম্ভব হলে অল্প বয়সে পরিকল্পনা করুন
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান দুটোই কমতে থাকে। বয়স বাড়লে এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর ফাইব্রয়েডের মতো সমস্যার আশঙ্কাও বাড়ে।
| বয়স | প্রতি মাসে স্বাভাবিক গর্ভধারণের আনুমানিক সম্ভাবনা |
| ২০–২৪ বছর | ২৫% |
| ২৫–২৯ বছর | ২০–২৫% |
| ৩০–৩৪ বছর | ১৫–২০% |
| ৩৫–৩৯ বছর | ১০% |
| ৪০ বছরের বেশি | ৫% বা তার কম |
সম্ভব হলে ২০ থেকে ৩০-এর গোড়ার দিকেই সন্তানের পরিকল্পনা করুন। পরে পরিকল্পনা থাকলে ডিম্বাণু সংরক্ষণ (এগ ফ্রিজিং) নিয়ে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।
১০. লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
সাধারণ অনেক লুব্রিক্যান্ট শুক্রাণুর চলাচলে বাধা দেয়। প্রয়োজন হলে “ফার্টিলিটি-ফ্রেন্ডলি” বা স্পার্ম-ফ্রেন্ডলি লেখা লুব্রিক্যান্ট বেছে নিন।
কিভাবে সহবাস করলে বাচ্চা হয়?
সঠিক সময় জানার পর দ্বিতীয় প্রশ্ন হল পদ্ধতি। এখানে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে, তাই বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার।
কতদিন অন্তর সহবাস করা উচিত?
উর্বর সময়ের ৬ দিনে প্রতিদিন অথবা একদিন অন্তর সহবাস করাই সবচেয়ে কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, উর্বর সময়ে প্রতিদিন সহবাসে প্রতি চক্রে গর্ভধারণের হার সবচেয়ে বেশি, এবং একদিন অন্তর সহবাসেও প্রায় সমান ফল পাওয়া যায়।
উর্বর সময়ের বাইরে সপ্তাহে ২–৩ বার স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখুন। এতে শুক্রাণুর গুণমান ভালো থাকে এবং সম্পর্কের উপর চাপও পড়ে না।
প্রতিদিন সহবাস করলে কি বাচ্চা হয়?
প্রতিদিন সহবাস করলে শুক্রাণু “দুর্বল” বা “পাতলা” হয়ে যায় বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, তা ভুল। প্রতিদিন বীর্যপাতে শুক্রাণুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও গতিশীলতা ও DNA-এর গুণমান বরং ভালো থাকে, কারণ শুক্রাণু বেশি দিন জমে থাকে না।
তবে উল্টো দিকটিও সত্যি: শুধু প্রতিদিন সহবাস করলেই বাচ্চা হবে না যদি সেটি উর্বর সময়ের বাইরে হয়। সংখ্যার চেয়ে সময়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ বিরতিও ক্ষতিকর। ৫–৭ দিনের বেশি বিরতি দিলে জমে থাকা পুরনো শুক্রাণুর গুণমান কমে যায়।
কোন পজিশনে সহবাস করলে বাচ্চা হয়?
বৈজ্ঞানিকভাবে কোনও নির্দিষ্ট পজিশন গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায় বলে প্রমাণিত হয়নি। শুক্রাণু বীর্যপাতের কয়েক মিনিটের মধ্যেই জরায়ুমুখ পেরিয়ে যায়, ফলে মাধ্যাকর্ষণ এখানে বড় ভূমিকা রাখে না।
তবে ব্যবহারিক দিক থেকে যে পজিশনে বীর্য যোনির গভীরে, জরায়ুমুখের কাছাকাছি পৌঁছয় সেটি সামান্য সুবিধাজনক হতে পারে, যেমন মিশনারি পজিশন। এর চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হল সহবাস আরামদায়ক ও চাপমুক্ত হওয়া। পজিশন নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করে দাম্পত্য সম্পর্ককে যান্ত্রিক করে তুললে হিতে বিপরীত হয়।
সহবাস করার পর কতক্ষণ শুয়ে থাকতে হয়?
সহবাসের পর ১০–২০ মিনিট চিত হয়ে শুয়ে থাকার পরামর্শ প্রচলিত আছে। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুব জোরালো না হলেও এতে ক্ষতি নেই, তাই চাইলে করতে পারেন। কোমরের নিচে বালিশ দেওয়ার দরকার নেই।
সহবাসের পর যা করবেন না
- সঙ্গে সঙ্গে উঠে বাথরুমে যাওয়া: অন্তত ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন
- যোনি ধোয়া বা ডুশিং করা: এতে যোনির স্বাভাবিক অম্লতা নষ্ট হয় এবং শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- সাধারণ লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার: বেশিরভাগ লুব্রিক্যান্ট শুক্রাণুর চলাচলে বাধা দেয়। প্রয়োজন হলে “ফার্টিলিটি-ফ্রেন্ডলি” লেখা লুব্রিক্যান্ট নিন
- সঙ্গে সঙ্গে গরম জলে স্নান বা সাঁতার: কোনও উপকার নেই
কিছুটা বীর্য বাইরে বেরিয়ে আসা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এতে চিন্তার কিছু নেই। যে শুক্রাণুগুলি এগিয়ে যাওয়ার সেগুলি কয়েক মিনিটেই চলে যায়।
বাচ্চা নেওয়ার আগের প্রস্তুতি
গর্ভধারণের প্রস্তুতি শুরু করা উচিত চেষ্টা শুরু করার অন্তত ৩ মাস আগে থেকে। কারণ ডিম্বাণু পরিণত হতে প্রায় ৯০ দিন লাগে এবং শুক্রাণু তৈরি হতেও প্রায় ৭২ দিন। অর্থাৎ আজ আপনি যে অভ্যাস বদলাবেন, তার ফল দেখা যাবে তিন মাস পর।
মহিলাদের করণীয়
- প্রি-কনসেপশন চেকআপ করান: থাইরয়েড (TSH), হিমোগ্লোবিন, ব্লাড সুগার, ভিটামিন ডি ও রুবেলা ইমিউনিটি পরীক্ষা করিয়ে নিন
- ফলিক অ্যাসিড শুরু করুন: চেষ্টা শুরুর অন্তত ১–৩ মাস আগে থেকে দৈনিক ৪০০ মাইক্রোগ্রাম। এটি শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি অনেকটা কমায়
- পুরনো রোগ নিয়ন্ত্রণে আনুন: ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে গর্ভধারণের আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি
- চলতি ওষুধ ডাক্তারকে দেখান: কিছু ওষুধ গর্ভাবস্থায় নিরাপদ নয়, আগেই বদলে নিতে হয়
- জন্মনিয়ন্ত্রণ বন্ধ করুন: পিল বন্ধ করার পর ১–২ মাসের মধ্যেই সাধারণত স্বাভাবিক চক্র ফিরে আসে
- টিকা নিন: রুবেলা ইমিউনিটি না থাকলে টিকা নিয়ে অন্তত এক মাস অপেক্ষা করুন
বাচ্চা নেওয়ার আগে পুরুষের করণীয়
বন্ধ্যাত্বের প্রায় ৪০–৫০% ক্ষেত্রে কারণ থাকে পুরুষের দিকে, অথচ প্রস্তুতির সময় সাধারণত শুধু স্ত্রীর দিকেই নজর দেওয়া হয়। এটি বড় ভুল। স্বামীর করণীয়:
- ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণ বন্ধ করুন: এটি শুক্রাণুর সংখ্যা ও DNA-এর গুণমান সরাসরি নষ্ট করে
- মদ্যপান কমান বা বন্ধ করুন
- অণ্ডকোষ ঠান্ডা রাখুন: অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের চেয়ে কম থাকা দরকার। দীর্ঘক্ষণ গরম জলে স্নান, সনা, কোলের উপর ল্যাপটপ, খুব আঁটসাঁট অন্তর্বাস ও একটানা বাইক চালানো এড়িয়ে চলুন
- জিঙ্ক ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টযুক্ত খাবার খান: কুমড়োর বীজ, বাদাম, ডিম, আমলকী
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন: অতিরিক্ত ওজন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দেয়
- এক বছর চেষ্টার পরেও ফল না এলে সিমেন অ্যানালাইসিস করান: এটি খুব সহজ, সস্তা ও ব্যথাহীন পরীক্ষা, অথচ অনেকেই এড়িয়ে যান
কি খেলে তাড়াতাড়ি গর্ভবতী হওয়া যায়?
কোনও একটি খাবার একা গর্ভধারণ ঘটাতে পারে না। তবে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস হরমোনের ভারসাম্য, ডিম্বাণু-শুক্রাণুর গুণমান ও জরায়ুর আস্তরণকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
| পুষ্টি | কেন দরকার | কোন খাবারে |
| ফলিক অ্যাসিড | শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের ত্রুটি প্রতিরোধ | পালং শাক, মেথি শাক, ব্রকোলি, ডাল, কমলালেবু |
| আয়রন | রক্তাল্পতা রোধ ও ডিম্বস্ফোটনে সহায়তা | কচু শাক, বিট, খেজুর, ডালিম, কলিজা |
| ওমেগা-৩ | হরমোনের ভারসাম্য ও রক্তসঞ্চালন | ইলিশ, রুই, সার্ডিন, আখরোট, তিসির বীজ |
| জিঙ্ক | শুক্রাণুর সংখ্যা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি | কুমড়োর বীজ, কাজু, ছোলা, ডিম |
| ভিটামিন ডি | ডিম্বস্ফোটন ও ইমপ্ল্যান্টেশনে ভূমিকা | রোদ, ডিমের কুসুম, মাশরুম, দুধ |
| অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট | ডিম্বাণু ও শুক্রাণুকে ক্ষতি থেকে রক্ষা | আমলকী, পেয়ারা, টমেটো, বেরি |
| উদ্ভিজ্জ প্রোটিন | ডিম্বস্ফোটনজনিত সমস্যার ঝুঁকি হ্রাস | ডাল, রাজমা, ছোলা, সয়াবিন |
যা সীমিত রাখবেন: ভাজাভুজি ও প্যাকেটজাত খাবারের ট্রান্স ফ্যাট, অতিরিক্ত চিনি ও মিষ্টি পানীয়, কাঁচা বা অর্ধসিদ্ধ মাছ-মাংস-ডিম, এবং উচ্চ পারদযুক্ত বড় সামুদ্রিক মাছ।
কোন ওষুধ খেলে বাচ্চা কনসিভ হয়?
এই প্রশ্নের সৎ উত্তর হল: নিজে থেকে কোনও ওষুধ খেয়ে গর্ভধারণ করা যায় না, এবং চেষ্টা করাও বিপজ্জনক।
ডিম্বস্ফোটন শুরু করার ওষুধ (যেমন লেট্রোজল বা ক্লোমিফেন সাইট্রেট) সত্যিই আছে এবং কার্যকর, কিন্তু সেগুলি দেওয়া হয় শুধুমাত্র তখনই যখন পরীক্ষা করে প্রমাণ হয় যে ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে না। ভুল কারণে বা ভুল মাত্রায় খেলে একাধিক ডিম্বাণু নির্গত হওয়া, ডিম্বাশয় ফুলে যাওয়া (OHSS) এবং যমজ বা তার বেশি সন্তানের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা মা ও শিশু দুজনের জন্যই বিপজ্জনক।
দোকান থেকে কিনে বা পরিচিত কারও পরামর্শে এই ধরনের ওষুধ কখনও খাবেন না। যা নিরাপদে নেওয়া যায় তা হল ফলিক অ্যাসিড ও ডাক্তারের পরামর্শে প্রিনেটাল ভিটামিন।
কি করলে বাচ্চা হয় না: যা এড়িয়ে চলবেন
- ধূমপান ও তামাক: নারীর ডিম্বাণুর সংখ্যা কমায়, পুরুষের শুক্রাণু নষ্ট করে
- অতিরিক্ত মদ্যপান: উর্বরতা কমায় এবং গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে শিশুর ক্ষতি করে
- অতিরিক্ত ক্যাফেইন: দিনে ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখুন, অর্থাৎ ১–২ কাপ কফি। চা ও কোল্ড ড্রিঙ্কেও ক্যাফেইন আছে
- ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ: বিশেষত হরমোনাল ওষুধ ও দীর্ঘদিনের ব্যথার ওষুধ (NSAID)
- অতিরিক্ত কঠোর ব্যায়াম বা অতিরিক্ত ওজন কমানোর ডায়েট
- দীর্ঘক্ষণ সহবাসে বিরতি: ৫–৭ দিনের বেশি নয়
- উর্বর সময়ের অপেক্ষায় সারা মাস সহবাস বন্ধ রাখা: এতে চাপ বাড়ে এবং সঠিক দিন হাতছাড়া হয়
- প্রতি মাসে ব্যর্থতা ধরে নেওয়া: সুস্থ দম্পতির ক্ষেত্রেও প্রতি মাসে সম্ভাবনা মাত্র ২০–২৫%। কয়েক মাস সময় লাগা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক
সহবাসের কতদিন পর গর্ভবতী হয়? লক্ষণ ও টেস্ট
নিষেক হয় সহবাসের কয়েক ঘণ্টা থেকে ৫ দিনের মধ্যে (শুক্রাণু কতদিন অপেক্ষা করেছে তার উপর নির্ভর করে)। তারপর নিষিক্ত ডিম্বাণুটি জরায়ুতে বসতে আরও ৬–১২ দিন সময় নেয়। অর্থাৎ সহবাসের প্রায় ১০–১৪ দিন পর থেকে শরীরে গর্ভধারণের হরমোন (hCG) তৈরি হতে শুরু করে।
গর্ভবতী হওয়ার লক্ষণ কতদিন পর বোঝা যায়?
সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য লক্ষণ হল মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর আগের লক্ষণগুলি অনেক সময় মাসিক-পূর্ব উপসর্গের সঙ্গে মিলে যায়, তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
পিরিয়ড মিস হওয়ার আগেই যে লক্ষণগুলি দেখা দিতে পারে
- ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং: সহবাসের ৬–১২ দিনের মাথায় খুব হালকা দাগ বা স্পটিং, মাসিকের চেয়ে অনেক কম
- স্তনে ব্যথা, ভার ভাব বা স্পর্শকাতরতা
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম ভাব
- হালকা তলপেটে টান বা ক্র্যাম্প
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ
- গন্ধে অস্বস্তি, খাবারে অরুচি বা হঠাৎ আসক্তি
- বমি বমি ভাব: যেকোনও সময়েই হতে পারে, শুধু সকালে নয়
- মেজাজের ওঠানামা
প্রেগন্যান্সি টেস্ট কখন করবেন?
মাসিকের নির্ধারিত তারিখ পার হওয়ার অন্তত এক দিন পর বাড়িতে ইউরিন প্রেগন্যান্সি টেস্ট করুন। এর আগে করলে hCG-এর মাত্রা কম থাকায় ভুল নেগেটিভ ফল আসতে পারে।
- সকালের প্রথম প্রস্রাব ব্যবহার করুন, কারণ এতে হরমোনের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি থাকে
- ফল নেগেটিভ কিন্তু মাসিক হচ্ছে না? এক সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা করুন
- আরও আগে জানতে চাইলে রক্তের বিটা-hCG পরীক্ষা করান, এটি সহবাসের ৮–১০ দিন পরেই গর্ভধারণ ধরতে পারে
- পজিটিভ এলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান এবং প্রথম আল্ট্রাসাউন্ডের সময় জেনে নিন
পিসিওএস থাকলে কী করবেন?
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) হরমোনজনিত একটি সমস্যা, যেখানে ডিম্বস্ফোটন অনিয়মিত হয় বা কখনও কখনও একেবারেই হয় না। মাসিক অনিয়মিত হওয়া, ওজন বেড়ে যাওয়া, মুখে অবাঞ্ছিত লোম বা ব্রণ, এগুলি সাধারণ লক্ষণ।
পিসিওএস মানেই কিন্তু বাচ্চা হবে না, তা নয়। বরং এটি বন্ধ্যাত্বের এমন একটি কারণ যার চিকিৎসায় সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। যা সাহায্য করে:
- ওজন কমানো: মাত্র ৫–১০% ওজন কমালেই অনেকের ডিম্বস্ফোটন নিজে থেকে ফিরে আসে
- কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের খাবার ও নিয়মিত ব্যায়াম: ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স নিয়ন্ত্রণে রাখে
- ডাক্তারের পরামর্শে ডিম্বস্ফোটন শুরু করার ওষুধ: যেমন লেট্রোজল বা ক্লোমিফেন সাইট্রেট
- প্রয়োজনে IUI বা IVF
পিসিওএস ধরা পড়ে থাকলে ১২ মাস অপেক্ষা না করে ৬ মাসেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বাচ্চা না হলে কি করতে হবে?
অনেক দিন চেষ্টা করেও ফল না এলে প্রথমেই মনে রাখুন যে এটি কারও দোষ নয়, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর চিকিৎসা আছে। দ্বিতীয়ত, সবচেয়ে বড় ভুল হল অপেক্ষা করে যাওয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার সাফল্যের হারও কমতে থাকে।
বন্ধ্যাত্বের সাধারণ কারণ
মহিলাদের ক্ষেত্রে
- ডিম্বস্ফোটনজনিত সমস্যা, পিসিওএস, থাইরয়েডের গোলমাল, উচ্চ প্রোল্যাকটিন
- ফ্যালোপিয়ান টিউব বন্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত, প্রায়ই আগের সংক্রমণের কারণে
- এন্ডোমেট্রিওসিস
- জরায়ুর ফাইব্রয়েড বা পলিপ
- বয়সজনিত ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান হ্রাস (কম ওভারিয়ান রিজার্ভ)
পুরুষদের ক্ষেত্রে
- শুক্রাণুর সংখ্যা কম বা একেবারে না থাকা
- শুক্রাণুর গতিশীলতা বা গঠনগত সমস্যা
- ভ্যারিকোসিল
- হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা সংক্রমণ
প্রায় ১০–১৫% ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা স্বাভাবিক আসার পরেও নির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায় না, একে বলে আনএক্সপ্লেইনড ইনফার্টিলিটি। এক্ষেত্রেও চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যায়।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?
| পরিস্থিতি | কখন দেখাবেন |
| স্ত্রীর বয়স ৩৫-এর কম | ১২ মাস নিয়মিত চেষ্টার পর |
| স্ত্রীর বয়স ৩৫ বা তার বেশি | ৬ মাস চেষ্টার পরেই |
| স্ত্রীর বয়স ৪০-এর বেশি | চেষ্টা শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই |
| মাসিক অনিয়মিত বা বন্ধ | সঙ্গে সঙ্গে |
| পিসিওএস, এন্ডোমেট্রিওসিস বা ফাইব্রয়েড আছে | পরিকল্পনার শুরুতেই |
| দু’বার বা তার বেশি গর্ভপাত হয়েছে | সঙ্গে সঙ্গে |
| আগে পেলভিক সার্জারি, সংক্রমণ বা কেমোথেরাপি হয়েছে | পরিকল্পনার শুরুতেই |
| স্বামীর আগে অণ্ডকোষে আঘাত বা অস্ত্রোপচার হয়েছে | পরিকল্পনার শুরুতেই |
প্রথমে কী কী পরীক্ষা হয়?
ভয়ের কিছু নেই। শুরুটা খুব সাধারণ পরীক্ষা দিয়েই হয়:
- স্ত্রীর: হরমোন পরীক্ষা (AMH, TSH, প্রোল্যাকটিন), পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড, এবং প্রয়োজনে টিউব খোলা আছে কি না দেখার জন্য HSG
- স্বামীর: সিমেন অ্যানালাইসিস, একটি সহজ, ব্যথাহীন ও কম খরচের পরীক্ষা
এই ফলাফলের ভিত্তিতেই ঠিক হয় শুধু জীবনযাপনে বদল যথেষ্ট, নাকি ওষুধ, IUI বা IVF দরকার। স্বামী-স্ত্রী দুজনে একসঙ্গে পরীক্ষা করানোই সঠিক পদ্ধতি, শুধু একজনের পরীক্ষা করালে অর্ধেক ছবি পাওয়া যায় এবং মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।
প্রচলিত ভুল ধারণা ও সত্য
| প্রচলিত ধারণা | আসল সত্য |
| প্রতিদিন সহবাস করলে শুক্রাণু দুর্বল হয়ে যায় | উর্বর সময়ে প্রতিদিন সহবাসেই সাফল্যের হার সবচেয়ে বেশি |
| নির্দিষ্ট পজিশন বা টোটকায় ছেলে সন্তান হয় | লিঙ্গ ঠিক হয় শুক্রাণুর ক্রোমোজোমে; নিয়ন্ত্রণ করা যায় না |
| বন্ধ্যাত্ব শুধু মহিলাদের সমস্যা | ৪০–৫০% ক্ষেত্রে কারণ থাকে পুরুষের দিকে |
| মাসিক নিয়মিত মানেই কোনও সমস্যা নেই | নিয়মিত মাসিকের সঙ্গেও টিউব বন্ধ থাকা বা এন্ডোমেট্রিওসিস থাকতে পারে |
| সহবাসের পর বীর্য বেরিয়ে এলে গর্ভধারণ হবে না | কিছুটা বেরিয়ে আসা স্বাভাবিক; শুক্রাণু কয়েক মিনিটেই এগিয়ে যায় |
| একবার গর্ভপাত হলে আর সন্তান হবে না | বেশিরভাগ মহিলার পরবর্তী গর্ভধারণ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয় |
| IVF মানেই শেষ পর্যায়ের চিকিৎসা | টিউব বন্ধ থাকলে বা বয়স বেশি হলে IVF প্রথম দিকের সঠিক সিদ্ধান্ত |
| শুধু মানসিক চাপ কমালেই বাচ্চা হয়ে যাবে | চাপ কমানো উপকারী, কিন্তু শারীরিক কারণ চিকিৎসা ছাড়া সারে না |
| বেশি বয়সেও চিকিৎসায় সহজেই বাচ্চা হয় | বয়সের সঙ্গে চিকিৎসার সাফল্যের হারও কমে; সময়মতো শুরু করা জরুরি |
উপসংহার
বাচ্চা নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি আসলে খুব জটিল কিছু নয়। মাসিকের হিসেব রেখে উর্বর সময় বার করা, সেই ৬ দিনে একদিন অন্তর সহবাস করা, স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং ফলিক অ্যাসিড, বেশিরভাগ দম্পতির ক্ষেত্রে এটুকুই যথেষ্ট।
প্রতি মাসে সাফল্য না এলে ভেঙে পড়বেন না; সুস্থ দম্পতির ক্ষেত্রেও প্রতি মাসে সম্ভাবনা মাত্র ২০–২৫%। তবে ৩৫ বছরের কম বয়সে এক বছর এবং ৩৫ বা তার বেশি বয়সে ছয় মাস চেষ্টার পরেও ফল না এলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। আধুনিক ফার্টিলিটি চিকিৎসায় আজ বহু দম্পতিই বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করছেন।
কেন আমাদের বেছে নেবেন?
| ১২০+ | IVF বিশেষজ্ঞ |
| ৯৫% | সন্তুষ্টির স্কোর |
| ৫০+ | সারা ভারতে ক্লিনিক |
| ১,৪০,০০০+ | দম্পতিকে সহায়তা |
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
বাচ্চা নেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী?
মাসিক শুরুর দিন থেকে হিসেব করে ডিম্বস্ফোটনের সময় বার করুন এবং তার আগের ৫ দিন ও ডিম্বস্ফোটনের দিন মিলিয়ে মোট ৬ দিনে একদিন অন্তর সহবাস করুন। সেই সঙ্গে ফলিক অ্যাসিড নিন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করুন।
মাসিকের কতদিন পর সহবাস করলে সন্তান হয়?
২৮ দিনের নিয়মিত চক্র হলে মাসিক শুরুর ৯ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে, বিশেষত ১২–১৪তম দিনে। চক্র অন্য দৈর্ঘ্যের হলে সূত্রটি হল: চক্রের মোট দিন থেকে ১৪ বাদ দিলে যে দিন পাওয়া যায়, তার আগের ৫ দিন ও ওই দিনটিই উর্বর সময়।
সহবাস করার কতদিন পর গর্ভবতী হয়?
নিষেক হয় সহবাসের কয়েক ঘণ্টা থেকে ৫ দিনের মধ্যে, আর জরায়ুতে প্রতিস্থাপিত হতে আরও ৬–১২ দিন লাগে। তাই সহবাসের প্রায় ১০–১৪ দিন পর থেকে গর্ভধারণ ধরা পড়ে। নিশ্চিত হতে মাসিকের তারিখ পার হওয়ার এক দিন পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট করুন।
প্রতিদিন সহবাস করলে কি বাচ্চা হয়?
উর্বর সময়ে প্রতিদিন সহবাস করলে সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন সহবাসে শুক্রাণু দুর্বল হয়ে যায় বলে যে ধারণা প্রচলিত, তা ভুল। তবে উর্বর সময়ের বাইরে প্রতিদিন সহবাস করলেও গর্ভধারণ হবে না, কারণ ডিম্বাণুই থাকে না।
সহবাস করার পর কতক্ষণ শুয়ে থাকতে হয়?
১০–২০ মিনিট চিত হয়ে শুয়ে থাকলে ক্ষতি নেই, যদিও এর পক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত। সঙ্গে সঙ্গে উঠে বাথরুমে যাওয়া বা যোনি ধোয়া এড়িয়ে চলুন। কিছুটা বীর্য বেরিয়ে আসা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
কোন পজিশনে সহবাস করলে বাচ্চা হয়?
কোনও নির্দিষ্ট পজিশন গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ায় বলে প্রমাণিত হয়নি। শুক্রাণু কয়েক মিনিটেই জরায়ুমুখ পেরিয়ে যায়। পজিশনের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি সঠিক সময়ে সহবাস করা।
বিয়ের পর কত দিনে বাচ্চা নেওয়া উচিত?
এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে ২০ থেকে ৩০-এর গোড়ার দিকে গর্ভধারণ সবচেয়ে সহজ, কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমতে থাকে। পরে পরিকল্পনা থাকলে ডিম্বাণু সংরক্ষণ (এগ ফ্রিজিং) নিয়ে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।
কোন ওষুধ খেলে বাচ্চা কনসিভ হয়?
নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে গর্ভধারণ করা যায় না এবং তা বিপজ্জনক। ডিম্বস্ফোটন শুরু করার ওষুধ শুধুমাত্র পরীক্ষার পর ডাক্তার দেন, কারণ ভুল ব্যবহারে ডিম্বাশয় ফুলে যাওয়া বা একাধিক সন্তানের ঝুঁকি থাকে। নিরাপদে নেওয়া যায় শুধু ফলিক অ্যাসিড ও ডাক্তারের পরামর্শে প্রিনেটাল ভিটামিন।
বাচ্চা না হলে প্রথমে কী পরীক্ষা করাব?
স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একসঙ্গে পরীক্ষা করান। স্ত্রীর ক্ষেত্রে হরমোন পরীক্ষা (AMH, TSH, প্রোল্যাকটিন) ও পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে শুরু হয়, আর স্বামীর ক্ষেত্রে সিমেন অ্যানালাইসিস, যা সহজ, ব্যথাহীন ও কম খরচের।
ছেলে সন্তান নেওয়ার কোনও সঠিক পদ্ধতি আছে কি?
না। সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারিত হয় শুক্রাণুর ক্রোমোজোম দিয়ে এবং তা সম্পূর্ণ দৈব। কোনও পজিশন, সময় বা খাদ্যাভ্যাস এটি বদলাতে পারে না। ভারতে লিঙ্গ নির্ণয় ও লিঙ্গ নির্বাচন PCPNDT আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
To know more
Birla Fertility & IVF aims at transforming the future of fertility globally, through outstanding clinical outcomes, research, innovation and compassionate care.
Had an IVF Failure?
Talk to our fertility experts